কক্সবাজারে জলবায়ু উদ্বাস্তুদের ফ্ল্যাট নিয়ে ‘বাণিজ্যের’ অভিযোগ
কক্সবাজার পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডে বসবাসরত জলবায়ু উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসনের জন্য নির্মিত ফ্ল্যাটের সুবিধাভোগী নির্বাচন নিয়ে অনিয়ম ও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকৃত জলবায়ু উদ্বাস্তুদের পাশাপাশি জেলার বাইরের বাসিন্দা, উত্তরবঙ্গের কিছু লোক, শহরে নিজস্ব বাড়ি রয়েছে এমন ব্যক্তি এবং রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর কিছু সদস্যের নামও সুবিধাভোগীর তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা চলছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে এসব অভিযোগের কথা জানা গেছে। নুর উদ্দিন, আকতার কামাল, ইসমাইল হোসেন মুন্না, নুরুসহ কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা ফ্ল্যাটের সুবিধাভোগী নির্বাচন, পুনঃতদন্ত ও অর্থ লেনদেন নিয়ে নানা অভিযোগ ও প্রশ্ন তোলেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, একই পরিবারের একাধিক সদস্যের নামে ফ্ল্যাট দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। কোনো কোনো পরিবারের পাঁচ থেকে ছয়জনের নামও তালিকায় রয়েছে বলে দাবি তাদের।
ফদনার ডেইল এলাকায় এ নিয়ে একটি চক্র সক্রিয় রয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। তাদের দাবি, পুরোনো টিন ও ত্রিপল দিয়ে অস্থায়ী ঘর তৈরি করে সেখানে ছবি তোলা হচ্ছে। পরে ওই ছবি ব্যবহার করে ফ্ল্যাটের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত করা হচ্ছে।
স্থানীয়দের বক্তব্যে সিভিল এভিয়েশনের মাঠকর্মী সোবাহান ও কবিরের নামও উঠে এসেছে। স্থানীয়দের কেউ কেউ তাদের একটি কথিত ‘সিভিল এভিয়েশন সিন্ডিকেট’-এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে অভিযোগ করেছেন। তবে সোবাহান ও কবির তাদের বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
ফ্ল্যাটের তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করে দেওয়ার কথা বলে একটি স্থানীয় চক্র ও সংশ্লিষ্ট কিছু কর্মচারী আবেদনকারীদের কাছ থেকে দুই থেকে তিন লাখ টাকা পর্যন্ত নিচ্ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। এতে প্রকৃত জলবায়ু উদ্বাস্তুদের বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
অভিযোগ রয়েছে, ইতোমধ্যে প্রায় ৭৩০টি ফ্ল্যাটের জন্য টোকেন দেওয়া হয়েছে। পরে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ ওঠায় নতুন করে তদন্ত শুরু হয়েছে। তবে এই পুনঃতদন্তের প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।
তাদের অভিযোগ, যেসব আবেদনকারীর নিজস্ব বসতঘর নেই, তাদের কারও কারও ক্ষেত্রে অন্যের বাড়ি বা ভিটায় ছবি তোলা হচ্ছে। এ জন্য তদন্তে আসা ব্যক্তিদের কেউ কেউ ১৫ হাজার টাকা করে নিচ্ছেন বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে।
স্থানীয়দের আরও দাবি, যাদের প্রকৃতপক্ষে কোনো বসতঘর নেই, তাদের কাছ থেকে দুই থেকে তিন লাখ টাকা নেওয়ার পর অন্যের ভিটায় ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা খরচ করে অস্থায়ী টিনের ঘর তৈরি করা হচ্ছে। পরে ওই ঘরে ছবি তুলে আবেদনকারীর নিজের ঘর রয়েছে—এমন প্রমাণ তৈরি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ। এভাবে প্রতিদিন বড় অঙ্কের অর্থ লেনদেন হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রশ্ন, সরকারি পুনর্বাসন প্রকল্পের সুবিধাভোগী নির্বাচনে সঠিকভাবে যাচাই-বাছাই না করে যদি অর্থের বিনিময়ে কাগজপত্র ও ছবি তৈরি করা হয়, তাহলে প্রকৃত জলবায়ু উদ্বাস্তুদের অধিকার কীভাবে নিশ্চিত হবে?
স্থানীয়দের দাবি, এসব অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হোক। অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
এদিকে স্থানীয় জলবায়ু উদ্বাস্তুদের দাবি, যারা দীর্ঘদিন ধরে ওই এলাকায় বসবাস করছেন, পুনর্বাসনের ক্ষেত্রে তাদের অগ্রাধিকার দিতে হবে। একই সঙ্গে স্থানীয়দের ওই এলাকাতেই স্থায়ীভাবে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করার দাবিও জানিয়েছেন তারা।
স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত অসহায় ও বাস্তুচ্যুত মানুষদের পুনর্বাসন। প্রকৃত সুবিধাভোগীদের বাদ দিয়ে অন্যদের ফ্ল্যাট দেওয়া হলে প্রকল্পের উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে।
তারা আরও প্রশ্ন তুলেছেন, যাদের নামে ফ্ল্যাট দেওয়া হচ্ছে, তাদের যদি ওই এলাকায় নিজস্ব জমি বা বসতভিটা না থাকে, তাহলে তারা কোথা থেকে উচ্ছেদ হয়ে পুনর্বাসিত হচ্ছেন? এ বিষয়টিও সঠিকভাবে যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন তারা।
ফ্ল্যাটের তালিকায় নাম ওঠানোকে কেন্দ্র করে স্থানীয় একটি দালালচক্র বা সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, এই চক্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু কর্মচারীর যোগসাজশ থাকতে পারে।
এতে একদিকে প্রকৃত জলবায়ু উদ্বাস্তু পরিবারগুলো ফ্ল্যাট পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তায় রয়েছে, অন্যদিকে অর্থের বিনিময়ে সুবিধা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
স্থানীয়দের দাবি, ৭৩০টি ফ্ল্যাটের সুবিধাভোগীর তালিকা, টোকেন বিতরণ, পুনঃতদন্ত, ছবি তোলা এবং অর্থ লেনদেনের অভিযোগ—সবকিছু নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হোক। একই সঙ্গে প্রকৃত জলবায়ু উদ্বাস্তুদের তালিকা পুনরায় যাচাই করে স্বচ্ছতার সঙ্গে চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন তারা।
কারা টোকেন পেয়েছেন, কীভাবে তাদের নাম তালিকায় এসেছে, পুনঃতদন্ত কীভাবে হচ্ছে এবং ছবি তোলার নামে কোনো অর্থ নেওয়া হচ্ছে কি না—এসব বিষয়ও তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
জলবায়ু উদ্বাস্তুদের জন্য নির্মিত এসব ফ্ল্যাট প্রকৃত অসহায় ও বাস্তুচ্যুত মানুষের পুনর্বাসনে ব্যবহৃত হবে—এটাই স্থানীয়দের প্রত্যাশা। তবে সুবিধাভোগী নির্বাচন নিয়ে ওঠা অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত না হলে প্রকল্পটি নিয়ে বিতর্ক আরও বাড়তে পারে বলে মনে করছেন তারা।