জলবায়ু উদ্বাস্তুদের ফ্ল্যাট নিয়ে পুনঃতদন্ত ঘিরে নতুন অভিযোগ
কক্সবাজারের খুরুশকুল জলবায়ু উদ্বাস্তু পুনর্বাসন প্রকল্পের ফ্ল্যাটের সুবিধাভোগী নির্বাচন নিয়ে অনিয়ম ও অর্থ লেনদেনের অভিযোগের পর এবার পুনঃতদন্ত ঘিরেও একটি মধ্যস্থতাকারী চক্র সক্রিয় হওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয়দের দাবি, প্রকৃত জলবায়ু উদ্বাস্তুদের পাশাপাশি জেলার বাইরের বাসিন্দা, নিজস্ব বসতভিটা থাকা ব্যক্তি এবং রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর কিছু সদস্যকে সুবিধাভোগীর তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করতে তৎপরতা চলছে। তালিকায় নাম রাখা, পুনঃযাচাইয়ে টিকে যাওয়া, কাগজপত্র তৈরি ও ছবি তোলার ব্যবস্থা করে দেওয়ার কথা বলে আবেদনকারীদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, কারও কাছ থেকে দুই থেকে তিন লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া পুনঃতদন্তের সময় ছবি তোলার নামে ১৫ হাজার টাকা করে নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। যাদের নিজস্ব বসতঘর নেই, তাদের অন্যের জায়গায় অস্থায়ী ঘর তৈরি করে বসতভিটার প্রমাণ তৈরির চেষ্টার অভিযোগও করেছেন স্থানীয়রা।
অভিযোগে সিভিল এভিয়েশনের মাঠকর্মী হিসেবে পরিচিত সোবহান ও কবির, স্থানীয় আকতার কামাল, নুরুউদ্দিন, ইসমাইল হোসেন মুন্না, স্থানীয়দের কাছে রোহিঙ্গা হিসেবে পরিচিত ইসমাইল ও হারুনের নাম এসেছে। তাদের বিরুদ্ধে ফ্ল্যাট পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাসে আবেদনকারীদের কাছ থেকে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ করেছেন স্থানীয়দের কেউ কেউ।
তবে অভিযোগকারী ও ভুক্তভোগীদের অনেকেই পরিচয় প্রকাশ করতে চান না। তাদের আশঙ্কা, নাম প্রকাশ হলে সুবিধাভোগীর তালিকা থেকে তাদের নাম বাদ পড়তে পারে। এ কারণে তারা পরিচয় গোপন রেখে অভিযোগের কথা জানিয়েছেন।
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, প্রকৃত বসতভিটা না থাকা কিছু আবেদনকারীর নামে অন্যের জায়গায় রাতের আঁধারে অস্থায়ী ঘর তৈরি করে সেখানে ছবি তোলার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। ফদনার ডেইল এলাকাতেও একটি খালি জায়গায় অস্থায়ী ঘর তৈরির অভিযোগ উঠেছে। পরে এসব ঘর বা জায়গা এলাকার বাইরের ফ্ল্যাটপ্রত্যাশীদের কাছে অর্থের বিনিময়ে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, গতরাত প্রায় ১১টার দিকে কামরুল, আনোয়ার, স্বপন ও জোসনা একটি কম্পিউটার দোকান থেকে জাতীয় পরিচয়পত্রসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের ফটোকপি করিয়ে নিয়ে যান। স্থানীয়দের দাবি, ফ্ল্যাটের তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তির জন্য এসব কাগজ ইসমাইলের কাছে জমা দেওয়ার কথা জানিয়েছেন তারা।
সরকারি ও নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, গত ২ আগস্ট খুরুশকুল জলবায়ু উদ্বাস্তু পুনর্বাসন প্রকল্পের ৭৩০ পরিবারের মধ্যে লটারির মাধ্যমে ফ্ল্যাট বরাদ্দ দেওয়া হয়। এর আগে ৬০০ পরিবারকে পুনর্বাসন করা হয়েছিল। সব মিলিয়ে এখন পর্যন্ত ১ হাজার ৩৩০ পরিবার পুনর্বাসনের আওতায় এসেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, টোকেন বিতরণের পর বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ ওঠায় সুবিধাভোগীদের পুনরায় যাচাই-বাছাইয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আর এই পুনঃতদন্তকে কেন্দ্র করেই অর্থ লেনদেনসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ সামনে এসেছে।
অভিযোগের বিষয়ে কক্সবাজার সদর এসিল্যান্ড মো. মশিউর রহমান বলেন, তিনি বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নন। তবে কার কাছ থেকে কত টাকা নেওয়া হয়েছে, তার প্রমাণ পাওয়া গেলে জড়িত ব্যক্তি যেই হোক, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। দরিদ্র মানুষের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই বলেও জানান তিনি।
কক্সবাজার সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তাহমিনা আক্তার বলেন, দরিদ্র মানুষের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার অভিযোগ দুঃখজনক। বিষয়টি নজরদারিতে রয়েছে।
খুরুশকুল প্রকল্পের সুবিধাভোগী নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক অবশ্য নতুন নয়। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে সরকার ২০১১ সালে তৈরি ৪ হাজার ৪০৯ জনের সুবিধাভোগীর তালিকা বাতিল করে। সরকারি প্রজ্ঞাপনে ওই তালিকাকে ‘ত্রুটিপূর্ণ, প্রশ্নবিদ্ধ ও পক্ষপাতদুষ্ট’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
পরে নতুন নির্দেশনার আলোকে প্রকৃত জলবায়ু উদ্বাস্তুদের তালিকা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়। যাচাই-বাছাই ও লটারির মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে পরিবারগুলোকে ফ্ল্যাট বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, পুরো প্রকল্পে ৪ হাজার ১২৮ পরিবারকে পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, প্রকৃত জলবায়ু উদ্বাস্তুদের অধিকার নিশ্চিত করতে সুবিধাভোগীর তালিকা, পুনঃতদন্ত, ছবি তোলা, বসতভিটার প্রমাণ এবং অর্থ লেনদেনের অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন।
তাদের মতে, আবেদনকারীদের জাতীয় পরিচয়পত্র, স্থায়ী ঠিকানা, প্রকৃত বসতভিটা, পরিবারের সদস্যসংখ্যা এবং জলবায়ুজনিত বাস্তুচ্যুতির তথ্য যাচাই করেই চূড়ান্ত তালিকা করা উচিত। একই সঙ্গে অর্থ লেনদেন বা সরকারি সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার নামে প্রতারণার অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।