মতামত | বিশ্লেষণ

বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ ও বিএনপির চার দশকের রাজনৈতিক পথচলা

Copied
বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ ও বিএনপির চার দশকের রাজনৈতিক পথচলা

মুহাম্মদ ফায়েজ, রাজনৈতিক কর্মী ও সাবেক শিক্ষার্থী চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা ও গণযোগাযোগ বিভাগ। ছবি সংগৃহীত

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ১ সেপ্টেম্বর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন। ১৯৭৮ সালের এই দিনে প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল—বিএনপি। স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত, অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল এবং রাজনৈতিকভাবে অস্থির একটি দেশের বাস্তবতায় দলটির আত্মপ্রকাশ ঘটে। আত্মনির্ভরশীল রাষ্ট্র গঠন, উৎপাদনমুখী অর্থনীতি এবং বহুদলীয় গণতন্ত্রের বিকাশ—এসব লক্ষ্যকে সামনে রেখেই বিএনপির রাজনৈতিক যাত্রার সূচনা।

একটি রাজনৈতিক দলের ইতিহাস কেবল ক্ষমতায় যাওয়া বা ক্ষমতার বাইরে থাকার ইতিহাস নয়। এর সঙ্গে যুক্ত থাকে একটি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক দর্শন, সমাজভাবনা, অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং ভবিষ্যৎ নির্মাণের পরিকল্পনা। বিএনপির দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলাও বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও সমাজের নানা পরিবর্তনের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত।

স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনীতিতে জাতীয় পরিচয় নিয়ে যে আলোচনা ও বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, সেই প্রেক্ষাপটে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সামনে আনেন ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’-এর ধারণা। ভৌগোলিক অবস্থান, রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব, ইতিহাস, সংস্কৃতি ও জনগণের সামগ্রিক পরিচয়কে ভিত্তি করে এই দর্শন গড়ে তোলার চেষ্টা করা হয়। এর মাধ্যমে দল-মত ও বিভিন্ন সামাজিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে একটি অভিন্ন রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের ধারণাকে রাজনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা দেখা যায়।

বিএনপির রাজনৈতিক ইতিহাসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় গণতান্ত্রিক আন্দোলন। আশির দশকের সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনে দলটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে ভূমিকা পালন করে। জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর বেগম খালেদা জিয়া দলের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। ধীরে ধীরে তিনি বিএনপিকে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় সংগঠিত করেন এবং জাতীয় রাজনীতিতে দলের অবস্থান সুদৃঢ় করেন।

নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। দীর্ঘ আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ১৯৯০ সালে এরশাদ সরকারের পতন ঘটে এবং দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পথ তৈরি হয়। সেই আন্দোলনের অংশীদার ছিল দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো। বিএনপিও এ আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পরবর্তী সময়ে নির্বাচন, ভোটাধিকার এবং গণতান্ত্রিক অধিকারকে কেন্দ্র করে দলটি বিভিন্ন রাজনৈতিক আন্দোলন ও কর্মসূচিতে সক্রিয় থেকেছে।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিবর্তনের ইতিহাসেও বিএনপির শাসনামলের বিভিন্ন নীতি ও উদ্যোগ আলোচনার দাবি রাখে। বেসরকারি খাত ও ব্যক্তিগত উদ্যোগকে উৎসাহ দেওয়ার মাধ্যমে অর্থনীতিতে নতুন গতিশীলতা আনার চেষ্টা করা হয়। কৃষি, গ্রামীণ উন্নয়ন এবং অবকাঠামো নির্মাণেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল।

জিয়াউর রহমানের শাসনামলে খাল খনন, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং পল্লী বিদ্যুতায়নের মতো কর্মসূচি গ্রামীণ অর্থনীতিতে পরিবর্তনের উদ্যোগ হিসেবে পরিচিতি পায়। অন্যদিকে পরবর্তী বিএনপি সরকারের আমলে মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট প্রবর্তনের মাধ্যমে দেশের রাজস্ব কাঠামোয় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসে।

দেশের তৈরি পোশাকশিল্প ও বিদেশে জনশক্তি রপ্তানি খাত বাংলাদেশের অর্থনীতির দুটি বড় ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এসব খাতের বিকাশের প্রাথমিক পর্যায়ে বিভিন্ন সরকারের ধারাবাহিক নীতিগত সিদ্ধান্ত ও উদ্যোগ ভূমিকা রেখেছে। বিএনপির শাসনামলের নীতি ও উদ্যোগও এই বিকাশের আলোচনায় উল্লেখযোগ্য।

আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক সহযোগিতাকে গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি বিএনপির রাজনৈতিক দর্শনের অন্যতম দিক। দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা—সার্ক প্রতিষ্ঠার উদ্যোগে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ভূমিকা বাংলাদেশের কূটনৈতিক ইতিহাসে বিশেষভাবে আলোচিত। আঞ্চলিক সহযোগিতার এই ধারণা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ ও সহযোগিতার একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি করেছিল।

বাংলাদেশের সামাজিক উন্নয়নেও বিএনপি সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ। বেগম খালেদা জিয়ার সরকারের সময়ে মেয়েদের শিক্ষা সম্প্রসারণ ও উপবৃত্তি কর্মসূচি নারীশিক্ষার প্রসারে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে। নারীশিক্ষার বিস্তার শুধু শিক্ষার হার বাড়ায়নি; দীর্ঘমেয়াদে নারীর সামাজিক অংশগ্রহণ ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রও সম্প্রসারিত করেছে।

অবকাঠামোগত উন্নয়নের ক্ষেত্রে যমুনা বহুমুখী সেতুর নির্মাণ সম্পন্ন হওয়া দেশের যোগাযোগব্যবস্থায় নতুন যুগের সূচনা করে। একইভাবে টেলিযোগাযোগ খাত বেসরকারি বিনিয়োগের জন্য উন্মুক্ত হওয়ার ফলে বাংলাদেশের যোগাযোগব্যবস্থায় দ্রুত পরিবর্তন আসে। পরবর্তীকালে মোবাইল ফোন ও ডিজিটাল যোগাযোগের বিস্তারের ক্ষেত্রেও এসব নীতিগত সিদ্ধান্তের প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ।

তবে কোনো রাজনৈতিক দলের দীর্ঘ ইতিহাস কেবল অর্জনের গল্প নয়; সেখানে থাকে বিতর্ক, ব্যর্থতা, আত্মসমালোচনা এবং নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়ার অভিজ্ঞতাও। চার দশকের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিএনপিকেও এমন নানা অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। ক্ষমতায় থাকা এবং বিরোধী দলে থাকা—উভয় অবস্থানেই দলটি নানা রাজনৈতিক সংকট ও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেছে।

বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের রাজনীতির সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলোর একটি হলো গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও কার্যকর ও শক্তিশালী করা, রাজনৈতিক সহনশীলতা বৃদ্ধি করা এবং জনগণের ভোটাধিকার ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। এই বাস্তবতায় বিএনপির মতো দীর্ঘ রাজনৈতিক ঐতিহ্যের দলগুলোর সামনে শুধু অতীতের অর্জন তুলে ধরাই যথেষ্ট নয়; সময়ের নতুন চাহিদা, তরুণ প্রজন্মের প্রত্যাশা এবং পরিবর্তিত অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মসূচি গ্রহণ করাও জরুরি।

বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ধারণা বিএনপির রাজনৈতিক পরিচয়ের কেন্দ্রবিন্দু। চার দশকের বেশি সময় ধরে এই ধারণাকে কেন্দ্র করেই দলটি তার রাজনীতি, সংগঠন ও রাষ্ট্রচিন্তার কাঠামো গড়ে তুলেছে। কিন্তু রাজনৈতিক দর্শনের প্রকৃত শক্তি প্রমাণিত হয় তার বাস্তব প্রয়োগে—জনগণের অধিকার, অর্থনৈতিক সুযোগ, সুশাসন এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে কতটা শক্তিশালী করা যায়, তার ওপরই নির্ভর করে সেই দর্শনের দীর্ঘমেয়াদি গ্রহণযোগ্যতা।

১ সেপ্টেম্বর তাই শুধু একটি রাজনৈতিক দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী নয়; এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়কে ফিরে দেখার উপলক্ষও। চার দশকেরও বেশি সময়ের এই যাত্রাপথে বিএনপি যেমন অর্জন ও সাফল্যের অংশীদার, তেমনি দেশের রাজনৈতিক পরিবর্তন ও নানা সংকটেরও প্রত্যক্ষ অংশীদার। ইতিহাসের এই দীর্ঘ পথচলা ভবিষ্যতের রাজনীতির জন্যও শিক্ষা ও মূল্যায়নের বিষয় হয়ে থাকবে।

মুহাম্মদ ফায়েজ
রাজনৈতিক কর্মী
সাবেক শিক্ষার্থী চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা ও গণযোগাযোগ বিভাগ।